"ঐতিহ্যের স্বাদে বাঙালির নিরামিষ পোলাও ও আলুর দম"




 আজকের পাতটা না হয় নিরামিষ দিয়েই সাজানো যাক

পোলাও এবং আলুর দমের এই যুগলবন্দী মিলন যেন এক পুরোনো গল্পের কথা মনে করিয়ে দিল। চলুন, শোনা যাক সেই গল্প।

শনিবার সকাল। রান্নাঘরে মশলার টুংটাং শব্দ আর ভেসে আসা ঘ্রাণ যেন জানিয়ে দেয় আজ কিছু বিশেষ হতে চলেছে। মা বা ঠাকুমার হাতের তৈরি মিষ্টি-নোনতা, সুবাসে ভরা পোলাওয়ের হাঁড়ি চুলোর পাশে বসে ফুটছে, আর পাশে কড়কড়ে ভাজা আলু মাখা হচ্ছে ঝাল-ঝোল মশলায়।বাচ্চারা লোভে লালা গিলছে, বড়রা ব্যস্ত দুপুরের আয়োজন নিয়ে কেউ থালায় শসা কেটে রাখছে, কেউ পেঁয়াজকুচি। আর রান্নাঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট আমি, অপেক্ষা করছি কবে সেই প্রথম গরম ধোঁয়া ওঠা থালা আমার সামনে আসবে।পোলাওয়ের মুগডালের ঘ্রাণ আর আলুর দমের ঝাল-মিষ্টি মশলার মেলবন্ধন একেবারে অদ্বিতীয়। প্রথম গ্রাসে নরম, সুবাসিত চালের দানা মুখে ঢোকে, আর পরের মুহূর্তেই আলুর দমের ঝাঁজ আর মিষ্টি স্বাদ জিভে ছড়িয়ে পড়ে যেন শনিবারের দুপুরটা হঠাৎ উৎসবে পরিণত হয়েছে।আজও যখন পোলাও আর আলুর দম খাই, মনে হয় এ শুধু খাবার নয়, এটি পরিবারের সঙ্গে কাটানো অলস, আনন্দময় শনিবার বিকেলের স্বাদ, যা বছরের পর বছর একই রকম রঙিন থেকে গেছে।

"স্বাদের গল্পে বাঙালির নিরামিষ পোলাও ও আলুর দম – মন ভরানো এক জুটি"

শনিবার বা নির্দিষ্ট পূজা-পার্বণে নিরামিষ রান্নায় এটি অন্যতম জনপ্রিয় জুটি।পোলাওয়ের মিষ্টি স্বাদ আর আলুর দমের ঝাঁঝালো ঝোল স্বাদের একটা সুন্দর ভারসাম্য আনে।পোলাও সাধারণত ঘি, কিশমিশ, কাজু দিয়ে সুগন্ধি করে বানানো হয়ে থাকে। আলুর দমে পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া রান্না করলে এটি পূর্ণ নিরামিষ থাকে। নির্বিঘ্নে ঠাকুরে ভোগ দেওয়াও যেতে পারে। এই জুটি পূজা, অন্নপ্রাশন বা অতিথি আপ্যায়নে কিন্ত বেশ মানানসই ।মিষ্টি পোলাও ও ঝাল আলুর দমের মিলন রসনাতৃপ্তি দেয় যেমন ঠিক সেরকম বাঙালি ঘরে শনিবার দুপুরে এই রান্না হলে গরম ভাতের মতো অপেক্ষা চলে পোলাও সাধারণত গোবিন্দভোগ চাল দিয়ে বেশি ভালো হয়, তবে বাসমতীও ব্যবহার করা যায়। আলুর দমে শুকনো মশলা ও টমেটো-আদার পেস্টের কষানো ঘন ঝোল থাকে। দুটো খাবারই ঘরে থাকা সাধারণ উপকরণ দিয়েই বানানো যায় সহজেই। তবে এর একটা বিশেষ গুণ হল কম সময়ে রান্না হলেও, পরিবেশন করলে অতিথি আপ্যায়নে রাজকীয় লাগে।ভাতপ্রিয় বাঙালির কাছে এটি নিরামিষের রাজপদ বলা চলে।গরম ধোঁয়া ওঠা পোলাও আর গাঢ় লাল রঙের আলুর দম চোখে মুখে জল আনিয়েই ছাড়ে। এটি বাঙালির নিরামিষ খাবারের সংস্কৃতির এক অপরিহার্য অধ্যায়।

পোলাও রেসিপি (৪ জনের জন্য)

উপকরণ:-

》গোবিন্দভোগ চাল – ৫০০ গ্রাম

》ঘি – ৪ টেবিল চামচ

》তেজপাতা – ২টি

》দারুচিনি – ২ ইঞ্চি

》এলাচ – ৪-৫টি

》লবঙ্গ – ৪-৫টি

》কাজু – ১২টি

》কিশমিশ – ১৫টি

》চিনি – ৩ টেবিল চামচ

》লবণ – স্বাদমতো

》গরম জল – ১ লিটার

》হলুদ/কেশর – সামান্য (রঙের জন্য)


 ■ এবার প্রস্তুত প্রনালীটা জেনে নেওয়া যাক--

 চাল ধুয়ে ২০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে পানি ঝরিয়ে নিতে হবে তারপর হাঁড়িতে ঘি গরম করে তেজপাতা, দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ ফোড়ন দিয়ে কাজু ও কিশমিশ হালকা ভেজে তুলে রেখে চাল দিয়ে ৩-৪ মিনিট ভেজে নেওয়ার পর লবণ, চিনি দিয়ে মিশিয়ে গরম জল দিয়ে দিতে হবে তারপর হালকা আঁচে ঢেকে রান্না করে, চাল সেদ্ধ হলে কাজু-কিশমিশ ও কেশর মিশিয়ে নামিয়ে নিলেই তৈরি পোলাও। 

     ◇ আলুর দমের রেসিপি নিয়ে একটু কথা বলা যাক-- 

উপকরণ:-
》ছোট সেদ্ধ আলু – ৫০০ গ্রাম
》টমেটো – ২টি (পেস্ট)
》আদা বাটা – ১ চা চামচ
》শুকনো লঙ্কা গুঁড়ো – ১ চা চামচ
》হলুদ – ১/২ চা চামচ
》জিরে গুঁড়ো – ১ চা চামচ
》ধনে গুঁড়ো – ১ চা চামচ
》গরম মশলার গুঁড়ো – ১/২ চা চামচ
》তেল – ৩ টেবিল চামচ
》তেজপাতা – ১টি
》লবণ – স্বাদমতো
》জল – প্রয়োজনমতো
》কাঁচা লঙ্কা – ২-৩টি

             ■এবার প্রস্তুত প্রণালী জানা যাক --

আলুগুলো সেদ্ধ করে খোসা ছাড়িয়ে হালকা ভেজে নেওয়ার পর কড়াইতে তেল গরম করে তেজপাতা ফোড়ন দিয়ে। আদা বাটা ও টমেটো পেস্ট দিয়ে কষিয়ে নেওয়ার পর শুকনো লঙ্কা, হলুদ, জিরে, ধনে গুঁড়ো দিয়ে কষাতে হবে।5টা ভাজা আলু দিয়ে নেড়ে গরম জল দয়ে মাঝারি আঁচে ঝোল ঘন হওয়া পর্যন্ত রান্না করতে হবে। তারপর আর কিছু না শুধুই গরম মশলা ও কাঁচা লঙ্কা দিয়ে নামিয়ে নিলেই তৈরি আমাদের এই শনিবারের নিরামিষ অপরাহ্ন ভোজ।
 

গরম পোলাওয়ের পাশে ঝোল-ঝোলা আলুর দম, উপরে ঘি ছিটিয়ে পরিবেশন করলেই শনিবার দুপুর হয়ে উঠবে উৎসবের মতো।







Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

"আলুর সাথে পোস্ত, সুখের কতো রোস্ত"

রঙে-ঘ্রাণে ভরা রান্নাঘর – নারকেল-দুধে চচ্চড়ি"

“গন্ধে-মাখা তালের বড়া, মনে সুর তোলে সারা”